Small journey

ছোট ছোট ঢেউ জুড়েই সুনামীর সৃষ্টি হয়

Showing posts with label সচলায়তন. Show all posts
Showing posts with label সচলায়তন. Show all posts

সমান্তরাল

অনেক দিন পর আবার লিখলাম সচলায়তনে। লেখাটা অনেকদিন আগেই শুরু করেছিলাম, শেষটা নামানো হয়নি। আজ কি করে যেন শেষ হলো অনেকগুলো শেষ কে ইতি টেনে। লেখক হবার অনেক কষ্ট। লেখারা সারাক্ষণই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। চরিত্রগুলো এসে মাথার চুল ধরে টানাটানি করে। এই আমারে মারলি ক্যান, ঐ তোর এত্ত বড় সাহস আমার প্রেমিকারে অন্যের লগে বিয়া দ্যাস ইত্যাদী ইত্যাদী।লেখার চেয়ে গ্রাফিক্সটা করে বেশি আনন্দ পেয়েছি। নিজের ডিজাইন দেখে নিজেই মুগ্ধ। সচলায়তনে নিজের নামে লিখতে ভয় লাগে, পাছে রোবোকপের কাছে ধরা পড়ে যাই। কেমন যেন লজ্জা লাগে। তাই অমাবস্যা নামে লিখি। তাছাড়া নিজের নাম বলতে আছেই বা কি, ছিন্নভিন্ন একগাঁদা অস্তিত্ব। নামের প্রসঙ্গ আসলেই সুনীলের সেই কবিতাটা মনে পড়ে যায় " আমার কেউ নাম রাখেনি, তিন-চারটে ছদ্মনামে আমার ভ্রমণ মর্তধামে "। আমার অবস্থাও তাই। বন্ধুরা বলে আমি ঘোলা মন। আমার সবটাই ঘোলা। আমিও ভাবি আসলেই তো সবটাই ঘোলা, কিন্তু ঘোলাটা করলো কে? লিংক টা এখানে http://www.sachalayatan.com/guest_writer/25178

সমান্তরাল


লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: বুধ, ২০০৯-০৬-২৪ ১৭:৩৭)
ক্যাটেগরী: |

-খোকা, এই খোকা, সাত সকালে জানালা খুলে রেখেছিস কেন? কতদিন বারণ করেছি হিমে বাইরে যাবিনা। ঠান্ডা লাগবে। কথা শুনিসনা কেন? কবে বড় হবি?

আমার সেকেলে মা। এই চব্বিশ বছরের উঠন্ত যৌবনকেও অনায়াসে কৈশোরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কখনো কখনো বাইরে যাবার সময় একটু ঝাঁড়ফুঁক, যদি কারো নজর লেগে যায়। অনেকটা বড় হয়েও আমি কপালে কাজলের টিপ পড়তাম। ছেলেরা ক্ষ্যাপাতো, কিরে তোর দুধের বোতল কই? মেয়েগুলো অবশ্য কিছু বলতো না। শুধু মিটমিট করে হাসতো। কোন কোন দিন টিপ পড়বো না বলে একটু আগে ভাগেই বাড়ি থেকে বেরোতাম। মা হয়তো গোয়াল ঘরে, কিংবা রান্নাঘরে ব্যস্ত। মোক্ষম সুযোগ।
- মা , আমার স্কুলে দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি গেলাম।
- খোকা, খোকা, শোন,দাঁড়া।
- কি হলো দেরী হয়ে যাচ্ছে তো।
- হোক দেরী, টিপ টা দেয়া হয়নি।
- মা আমি এখন বড় হয়েছি। মা মুখ টিপে হেসে আমার হাফপ্যান্টের দৈর্ঘ্য দেখে নেয়। যেদিন ফুল প্যান্ট পড়বি, সেদিন বুঝবো বড় হয়েছিস। এখন কাছে আয় টিপ পরিয়ে দেই।
-মুখটা হাঁড়ির মত করে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকি। ভরা র্পূণিমার চাঁদের মত আস্ত একটা টিপ আমার কপালের আকাশে আলো ছড়াতে থাকে। আর আমি স্রষ্টার কাছে তারস্বরে প্রার্থনা করি, আল্লাহ্ , তাড়াতাড়ি আমাকে বড় করে দাও। একনিমেষেই যেন স্রষ্টা দিন, মাস, বছর গড়িয়ে আমার অপেক্ষার ক্লান্ত গাড়িকে বয়সের প্লাটফর্ম থেকে হাফপ্যান্ট নামের স্টেশন থেকে ফুলপ্যান্টের স্টেশনে পৌঁছে দেবে।

গ্রাম দেশে ফিডারের প্রচলন তেমন একটা নেই। অনাহারে, অর্ধাহারে আমার মায়ের বুক শুকিয়ে গিয়েছিল সেই আতুঁড় ঘরেই। মার মুখে শুনেছি যতদিন লাল গাভিটার বুকে দুধ ছিল ততদিন বাছুরটা’কে একটু কম খেতে দিয়ে দুধ গুলো সব আমাকে একটা বোতলে ভরে নিপল লাগিয়ে খাওয়ানো হত। মায়ের কোলে শুয়ে নিরেট বোতলটার বুক চিরে অমিয় সুধা টেনে টেনে পান করতাম। আর ঐদিকে গোয়াল ঘরে বাছুরটা আমাকে অভিসম্পাত করতে করতে খইল মেশানো খড়-ভূষি খেয়েই বড় হতে থাকতো। বড় হয়ে অনেক দিন মনে মনে বাছুরটা’কে বলেছি-
-হ্যাঁরে ধলা, তোকে আমি ঠকিয়েছি না? তোর ভাগের দুধগুলো খেয়েই তো আমি বড় হয়েছি। কি করবো বল, আমি যে ঘাস খেতে পারিনা। তুই তো জানিস আমার বাবা নেই। মামাদের কাছ থেকে আর কতইবা নেয়া যায়। তাদেরও তো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। আমি যদি তাড়াতাড়ি বড় না হই তাহলে কি করে মা’র দু:খ ঘোচাবো বল? তুই তো দেখিস কত কষ্ট আমার মায়ের। মন খারাপ করিস না, আমি যখন বড় হবো, মস্ত বড় চাকরী করবো, তখন তোকে মেলা মেলা দুধ কিনে খাওয়াবো। কিরে , তখন আমায় ভাগ দিবি তো, নাকি একাই সব খেয়ে নিবি?
-খোকা, খোকা, কি করছিস ওখানে?
-ধলা’কে খাওয়াচ্ছি। এই ফাঁকে বলে নেই ধলা বাছুরটার নাম।
-তোর খাওয়াতে হবে না । তুই পড়তে বস।আমি দেবোক্ষণ। কথা না বাড়িয়ে সুবোধ ছেলের মত পড়তে বসে যাই। যাবার আগে ধলাকে হয়তো ফিসফিস করে বলে যাই, ধলা মনে থাকে যেন, তখনকার সব দুধ তোর, আমি একটুও ভাগ নেবোনা, দেখিস।
-খোকা। মা বিরক্ত হয়। ধলার সাথে তোর এত কি কথা রে?
-আমি সূর্যের হাসি হেসে মা’কে বুঝিয়ে দেই ঘটনা অতীব গুরুত্বর্পূণ। তৃতীয় পক্ষের প্রবেশ নিষেধ। মা বুঝে নেয় এ আমার আর ধলার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই কথা না বাড়িয়ে বলে,
-কি জানি, তোর ব্যাপার স্যাপার আমার মাথায় কিছুই ঢোকে না। এখন পড়তে বস।
আমি মাথা নেড়ে বিজ্ঞের মত বলি,
- বুঝলে মা, আমি একদিন মস্ত বড় কিছু হবো, হাতির মত।
মা হেসে কুটিকুটি। তার ছেলে বড় হয়ে কিনা হাতি হবে।
-হ্যাঁ রে হাতি হলে তুই ফুলপ্যান্ট পড়বি কি করে? অতবড় ফুলপ্যান্ট বানাতে দোকানের সব কাপড় ফুরিয়ে যাবে না? মা হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে।আমার ছোট্ট মাথায় কিছুই ঢোকেনা, ভুলটা কি বললাম।

কোন কোন দিন মাথা চুলকে দিদিভাই কে জিজ্ঞেস করি, হ্যাঁরে দিদিভাই, আমি ভুল কি বলেছি বল? মা শুধুই হাসে। দিদিভাই বোঝেনা তার ছোট্ট ভাই বন্ধুটি কি ভুল করলো। গালে হাত দিয়ে পন্ডিতের মত দুই অবুঝ শিশু পৃথিবীর সব জটিলতা উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে যাই।
-শোন খোকা, হাতিরা তো ফুলপ্যান্ট পড়েনা। সার্কাসে দেখিসনি হাতিগুলো উদোম থাকে। বুদ্ধু, বড় হলে কি আর ন্যাংটোপুটু থাকা যায়? আমিও ভাবি ।
-আচ্ছা, হাতিরা না হয় উদোম থাকে কিন্তু বানরগুলো?
এবার দিদিভাই মায়ের চেয়েও বেশি হেসে ওঠে। হাসির ঝলকে ওর মোমের মত ছোট্ট দেহটা মাটিতে গড়াগড়ি খায় আর আমি মুখ শক্ত করে রাগে ফুঁসতে থাকি। মেয়েদের বুদ্ধি আসলেই কম। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মশকরা?
-দিদিভাই। আমি খেঁকিয়ে উঠি।
-কিরে খোকা?
-হাসছিস যে বড়?
-বারে , হাসি পেলে হাসবোনা? আচ্ছা খোকা, তুই বাদঁড়ের মত বড় হয়ে সারাক্ষণ কি এমন করে মুখ ভেংচাতে থাকবি? বলেই দিদিভাই মুখটাকে ভ্যাংচাতে থাকে। দিদিভাই, আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু, প্রিয় সাথী। ছুতোরের মেয়ে বলে ভদ্র সমাজের ছেলেমেয়েরা ওর সাথে মেশেনা। আমি মুসলমানের ছেলে হয়েও কিভাবে যেন ওর ছোট্ট হৃদয়টাকে দখল করে ফেলেছি। একমাত্র শিশুদের কাছেই কোন প্রভেদ নেই। মানুষ যত বড় হয় ততই বৈষম্যর বেড়াজালে একটু একটু করে জড়িয়ে যায়। চাইলেও অনেকসময় এড়াতে পারেনা। যারা পারে তাদের সমাজ অন্য চোখে দ্যাখে ।

সময়ের গাড়ি চড়ে আমি একদিন সত্যিই হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্টের রাজত্বে পা রাখি।আমি খোকা ভবিষ্যত খোকাদের আবাসস্থল হিসেবে নিজেকে গড়তে থাকি। মা অবাক হয়ে দ্যাখে তার খোকা একটু একটু করে কত বড় হয়ে গেছে। গালের সেই কমনীয়তা নেই। হেমন্তের ধান গাছের পরিত্যক্ত শিকঁড়ের মত সারাটা মুখে খসখস খসখস। হাতগুলোকে নিজের মনে হয় না।চামড়ার দেয়াল ভেদ করে বটবৃক্ষের শাখার মত এখানে ওখানে বেড়ে উঠছে পশমের আস্তরণ। বিব্রত লাগে। নিজেকে কেমন অচেনা মনে হয়। নিজের গলার স্বর শুনে নিজেই চমকে উঠি। একটু মোটা, একটু ভারী ।কয়েকদিনেই আমি খোকা থেকে অন্য মানুষে বদলে যাই। হয়তো দুইশ সত্তর কিংবা চারশ চব্বিশ কিংবা আরো কিছু কমবেশি সূর্য ওঠা। নিজেকে লুকিয়ে রাখি ।পাছে মার চোখে আরো বেশি বড় হয়ে যাই। মায়ের বুকটা ভাবনার নদীতে হারিয়ে যায়। একটু একটু করে খোকা কেমন বদলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে নিজের পেটের উপর হাত বুলিয়ে ভাবতে থাকে এই ছেলেটাকেই সে গর্ভে ধরেছিল কিনা। সদ্য বেড়েওঠা গোঁফের কাটাঁঝোপগুলোর আড়ালে যে মুখটা লুকিয়ে আছে সে যেন খোকা নয়, অন্য মানুষ, অন্য এক খোকা যে পরির্পূণ হবার প্রতিক্ষায় আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস জীর্ণ দেয়ালের ঝুলগুলোকে ছুঁয়ে যায়। তার সেই ছোট্ট খোকা কোথায় গেল?

কখনো কখনো অবহেলায় সার-সেচ ছাড়াই মুখের জমিতে ঘন আগাছা জন্ম নেয়। তারপর কোন একদিন সময় বুঝে সেই বনভূমি উজাড় করতে লেগে যাই। জীবনটা যেন কেমন, চলতে চলতে মাঝে মাঝে স্থবির হয়ে যায়।প্রিয়মুখগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। ধলা কিন্তু এখন অনেক বড়, রীতিমস্ত আস্ত একটা ষাঁড়। আমাকে মোটেই তোয়াক্কা করেনা। শিং বাঁকিয়ে ফোঁসফোঁস করতে করতে যেন বলে, দ্যাখো খোকা, আমি হাতির মতই বড় হয়েছি। আর তুমি এত এত দুধ খেয়ে কি করলে? মাঝ থেকে দুধগুলো আমি খেলে আরো একটু বেশি সবল হতাম।কলেজ, র্ভাসিটি.........সময় কি করে গড়িয়ে যায়। মায়ের মেঘের মত কালো চুলে রং ধরে। সাদা সাদা, কালো কালো। মাঝে মাঝে ধলার কথাগুলো মনে মনে আওড়াই, হয়তো খইল ভুষি খেয়ে বড় হলেই ভাল হতো। নইলে এত এত দুধ খেয়ে বড় হয়ে ওঠা এই আমি গাঁদা গাঁদা বই পড়েও একটা ভাল চাকরী পেতে হিমসিম খেয়ে যাই।চাকরীর পড়া পড়তে পড়তে আনমনে জানালার ফাঁক দিয়ে কখনো সখনো চেয়ে দেখি ধলা আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে । ওর নীরব চোখের ভাষা যেন চুপচুপ করে বলে যায়
-খোকা,আর কত পড়বে খোকা। একটু তাড়াতাড়ি পড়ো আর যে সয় না। আমি সবভুলে পড়ায় ডুবে যাই। সামনে কত কাজ। শীতের কোন এক সন্ধ্যায় মায়ের পেটের ব্যথাটা হঠাৎ হাই তুলে জেগে ওঠে। তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নেই। কিডনিতে ইনফেকশন। অপারেশন করতে হবে। অনেক, অনেক টাকা দরকার। জমি-জমা সব বন্ধক রেখেও শেষ রক্ষা হয়না। ডাক্তারের তাগাদা, তাড়াতাড়ি করেন , নইলে আপনার মাকে বাঁচানো যাবে না। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত দেহটা'কে বিছানায় এলিয়ে দিতে দিতে বাইরে চোখ রাখি। জ্যোৎস্নার আলোয় ধলার চোখ দুটো চকচক করছে। আমার মনে আশার আলো জ্বলে ওঠে। আমি সব ভুলে যাই।

স্যালাইনের পাইপ চুঁইয়ে চুঁইয়ে জীবনের সার প্রবেশ করছে মায়ের শরীরে। নরম কোমল পাঁপড়ি মেলে মায়ের চোখ দেখছে পৃথিবীর মুখ। আর অন্য দিকে , অন্য একটা ঘরে ধলার টানা টানা চোখদুটো বুঁজে আসছে। কসাইখানার দূর্গন্ধের ভেতর থেকে ধলার শেষ নিশ্বাস হাসপাতালের বেঞ্চে বসে থাকা খোকার চুলগুলোকে এলোমেলো করে দেয়। হাসপাতালের সমস্ত রোগীদের চিৎকার ছাপিয়ে খোকার কানে কানে ধলা যেন বলে যায়, খোকা, আমিতো তোমার ভাই ছিলাম .......................

অমাবস্যা
২৪ জুন, ২০০৯


আজাকারের লাগি

অনেকদিন পর গতপরশু সচলায়তনে লিখলাম । জানিনা কেমন হলো । কিছু একটা করার দায়বদ্ধতা থেকে লিখা । লিংক :

http://www.sachalayatan.com/guest_writer/24434#new

আজাকারের লাগি


লিখেছেন অতিথি লেখক (তারিখ: মঙ্গল, ২০০৯-০৫-১৯ ০৩:০২)
ক্যাটেগরী: | | | |

(উৎসর্গ : ভালবাসার রক্ত ঢেলে যারা গড়ছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ )
- স্যার মনে হয় ওর হাতের আঙ্গুলগুলান বেশি লম্বা। একটু কাইট্যা দিলেই সব সাইজ হইয়া যাইবো। তহন আর কিছু লেখবার পারবোনা। হালা বইলে শিক্ষিত, দ্যাহেন তো স্যার , সামান্য একখান কথা কইতে পারেনা আবার বইলে ভাষার জন্য যুদ্ধ করছে। হাম তিনবার প্যারাইমারী ফেইল দিয়াও ওর চেয়ে ভাল কইতে পারি। পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

মাঝরাতে দেয়ালের গাঁথুনিতে, সিলিংয়ের কোণায় বাড়ি খেয়ে কথাগুলো ঠুকঠাক করতে থাকে । মস্তবড় এই দালানের একটুকরো ইট আমি আড়ি পেতে থাকি আরো কিছু শোনা যায় কিনা। প্রায় প্রতিরাতেই কিছু না কিছু ঘটছে। দিনগুলোও বাদ পড়ে নেই । ফাগুনের এই শেষ বিদায়ের বেলায় আমরা ঘরের প্রতিটি কাঠ, আসবাব, ইট, সিমেন্ট, সুরকি চুপিচুপি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি । কখনো ঔৎস্যুক চোখে , কানের ফুটোগুলোকে একটু বড় করে একাত্তর দেখি।

ওপাশে চেয়ারে বসে থাকা মানুষটার পেশীগুলো তখন ফুঁলে উঠেছে। কিছু না করতে পারার ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে শরীরের কোষে কোষে। যদি একবার হাতের মুঠোয় পেতো। একটা দীর্ঘশ্বাস লুটোপুটি খায় শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বাম নিলয় থেকে ডান নিলয়ে, কলিজায়।পরক্ষণেই ঝলকে উঠে পেশীগুলো শান্ত হয়ে আসে। হাত দুটো বাঁধা। চুলগুলোকে কে যেন মুঠোর মধ্যে প্রবল আক্রোশে চেপে ধরে। আড়চোখে তাকিয়ে দেখে মাতৃভূমির বিশ্বাসঘাতক সন্তানের মুখ । শরীফ সর্দার। একদিন কবরের মাটিও যাকে আলিঙ্গন করতে অস্বীকার করবে।

-আপ কুছ লেঙ্গে কেয়া? ঠান্ডা অর কফি? সিগরেট পিয়েঙ্গে আপ? ও হাম তো ভুল হি গ্যায়া, আপ মুসলমান হে। আরে হাম তো ভাই স্রেফ মু বোলি মুসলমান হ্যায়। থোরা সা জাম , থোরা নাম অর থোরা সা ............মুখটা’কে অশ্লীলভাবে বিকৃত করে মেজর কিছু একটা অসভ্য ইঙ্গিত করে।

- মি: রাইটার , শুনাহে আপ রোমান্টিক কাহানী লিখতাহে বহত খুউব। ক্যান ইউ ইমাজিন দ্যাট হাম আপকা আম্মি কে সাথ সুহাগ রাত মানানে গেয়ি অর আধি রাত কো .........হা হা হা । এক পশলা কুৎসিত হাসি সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। চেয়ারে বসে থাকা মানুষটা’র চোখদুটো রর্ক্তাত্ত হয়ে ওঠে যেন চোখ দিয়েই ধূলিস্মাৎ করে দেবে সামনে দাঁড়ানো মানুষরুপী জানোয়ারটিকে।
- আরে , আপতো বহত গুছ্ছেমে হে। আরে ভাই , হাম বুরা ক্যা বোলা? আপকো মন্জুর নেহি তো হাম নাহি যায়েঙ্গে আপকা ঘর আপকা আম্মিকে সাথ সুহাগরাত মানানে। লেকিন ইসকে লিয়ে আপকো তো কুচ দেনে পড়েগা হামকো। সমঝিয়ে সাম স্মল গিফট। কেয়া আপকো হামারি দোস্তী মন্জুর হ্যায়? সামনের চোখ দুটো নির্বাক। জানোয়ারটা কি বলতে চায়।

-নো নো আপ টেনশন মাতলো। হাম কুচ মেহেঙ্গা গিফট নাহি মাঙ্গতা, আপ স্রেফ ইয়ে কাহিয়ে আপকা আউর সাথি কাহা হে । হাম আপকো ছোড় দেঙ্গে।

একদলা রর্ক্তাত্ত থুথুর শিলাবৃষ্টি চেয়ারের দিক থেকে ছুটে আসে। মেজরের মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে লাল-সাদা থুথুর বৃষ্টি।
-শালা হারামকে আওলাদ। কাট দো উসকে হাত কো।

-হ স্যার, হামভি ইয়ে বলতে চাই। উসকা হাত কাইট্যা দ্যান, তারপর দেহি কোন হাত দিয়া শালা বন্দুক ধরে, কলম দিয়া রাইট করে। চেয়ারে বসে থাকা মানুষটার হাতদুটোকে সুপারীর মত ঝাঁতার বাহুডোরে আবদ্ধ করে দেয় শরীফ সর্দার । তারপর টুক করে একটা শব্দ, শূন্য থেকে কয়েকটা আঙ্গুল পাকা করমচার মত টুপ করে মাটিতে খসে পড়ে।

-দেখলি তো আমি কি করবার পারি। শরীফ ফুঁসে ওঠে ।

-একদিন এই হাত দিয়া তুই আমার কলাট চাইপ্যা ধরছিলি মনে নাই? দুষটা কার বেশি ছিল ক, আমি না হয় তোর সুন্দরী বউটার দিকে চাইছিলাম, তুই ক্যান অমন সুন্দর একটা মাইয়া বিয়া করছিলি? ক? চুপ কইরা থাহস ক্যা? অহন তো তর বউ, ঘর সব ভ্যানিশ।

-পানি, পানি। একটু পানি। গলাটা শুকিয়ে আসছে। একটু পানি............চেয়ারের উপরে থাকা মানুষটা চেঁচিয়ে ওঠে ।

-শরীফ সাহাব, আপকা পাস কুছ হ্যা কেয়া , উসকো পিলাইয়ে না। আফটার অল ইয়ে আপকা মুল্লুকটা লেড়কা হে। মেজর সাহেবের গলায় দরদ উপচে পড়ে।

-হ স্যার, জরুর হ্যায়। হামারা তল পেট কুচ ভরা ভরা লাগতা। স্যার হাম আভি আতিহে। পা চাটা কুকুরের মত কুঁইকুঁই করতে করতে শরীফ ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেজরের হুকুম তামিল করতে।

-আরে শরীফ সাহাব, আপ উধার কাহা যাতিহে, এহি আনজাম করো না। যরা হামভি দেখে।
শরীফ তার তলপেট খালি করে সবটুকু শয়তানীর নির্যাস চেয়ারের উপর বসে থাকা মানুষটার তৃষ্ণার্ত ঠোঁটদুটোর দিকে ছড়িয়ে দেয়। ক্লান্ত দেহটা ঘৃণায় কুকঁড়ে ওঠে।

-আল্লাহ তোদের কক্ষনো ক্ষমা করবে না শয়তান। একদিন এই বাংলাদেশে তোরা কুকুরের মত মরে থাকবি।রাগে , ঘৃণায় , ক্ষোভে চেয়ারটা দুলে ওঠে।

-আমি শয়তান? শরীফ খেঁকিয়ে ওঠে। দেহাইতাছি কেডা কুকুরের মত মইরা থাহে। মেজর সাব, ইয়ে আপকো শয়তান বোলা। এইডারে বেহেস্তে পাঠানোর বন্দোবস্ত করদি জি য়ে স্যার। দেরী করলে কিন্তুক ব্যাটা আমগোরেই বেহেস্তে পাঠাইয়া দিবো।

-নাহি, ইয়ে ছোটামোটা কাম তুমহি করো। হামারা তবিয়ত আচ্ছি নেহি হে। হামকো থোরাসা চেন্জ জরুরত হ্যায়। নয়া মাল কো আচ্ছি সে পিনা হ্যায়। ক্যায়সি খুবসুরত। হ্যায়, নিন্দ উড় গ্যায়ী।

চল, বেজন্মার পূত, আল্লাহর কাছে যাইয়া পরাণ ভইরা আমগো গাইল পার। কোরবাণীর ছুরি টা বাতাসে লাফিয়ে ওঠে ।আল্লাহু আকবর.............রক্তের স্রোত ঘরটাকে ভাসিয়ে দেয়। চেয়ারের উপর বসে থাকা বন্দী দেহটা একসময় দেহের খাঁচা ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমায়।

অমাবস্যা
১৯মে ২০০৯


সচলায়তনে লেখা প্রথম গল্প


লিংক :
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/22804

ক্ষত

(এক পরিচিতার কাছে জানতে চেয়েছিলাম '৭১ এর বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস। কথা প্রসঙ্গে বললেন এক বৃদ্ধার কথা যাকে মিলিটারীরা প্রশ্ন করেছিল পুরানধানে কি খই হয়? বৃদ্ধা না বুঝেই মাথা নেড়েছিল। পুরষ্কার হিসেবে তাকেও বরণ করতে হয়েছিল বীরাঙ্গনার গল্প।'৭১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তাদের স্মরণে যাদের ভালবাসায় পূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ।)

আমিও মৃতদের দলে। যারা বেঁচে থেকে মরে আছে। মাঝে মাঝে ভুলে যাই বেঁচে আছি না মরে গেছি। গাঁদা গাঁদা মৃতদের ভিড়ে নিজেকেও মৃত বলে মনে হয়। যন্ত্রের মত মৃতদেহগুলোকে কবরে নামাই। মেয়েগুলোকে দেখলে শরীর শিউরে ওঠে। একটা প্রশ্ন মনের ভেতর ঘুরপাক খায়, মেয়েদের শরীরটাই কি মেয়েদের বড় শত্রু ? শরীরগুলোর দিকে তাকানো যায় না। স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে বেয়োনেটের খোঁচা। কোথাও মাংসপিন্ড নেই। সারামুখে , সারা শরীরে অসংখ্য নখের আচঁড়, দাঁতের ফলা কোথাও সৃষ্টি করেছে গহব্বর। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত সেই গহব্বরে সৃষ্টি করেছে কৃত্রিম হ্রদ। লাল লাল পানিতে সাঁতার কাটছে মাছি। বুকের পর্বত পাশেই পড়ে আছে, ছেঁড়া, রক্তাত্ত। কোথাও বাসা বেধেঁছে মেটে ইদুঁর। লাল-কালচে রক্তে সারি সারি পিঁপড়ের সারি। পুরুষগুলোর কারো চোখ বাঁধা, বেয়োনেটের আঘাতে জর্জরিত। গলিত, কর্দমাক্ত, বিভৎস লাশগুলোকে দেখলে চোখ দুটো বুঁজে আসে। কোন মতে মাটি চাপা দেই। কোন কোন দিন মাঝরাতে ডিউটি দিতে দিতে ভাবি যারা ছিল, তারা সব কোথায় গেল, কোন অজানা রাজ্য, চুপিচুপি । কেউ তো একবারো ফিরে এসে বললো না কোথায় গিয়েছে তারা, কেমন আছে।

ঘুম ঘুম চোখে কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে লেফট-রাইট করতে করতে ধান ক্ষেতের দিকে হাঁটা শুরু করি। কখনো কখনো মাটির উচুঁ ঢিবিটার উপর বসে দেখতে চেষ্টা করি কোথাও কিছু দেখা যায় কিনা। আকাশে র্পূণ মাসির চাঁদ।বাতাসে তখনো মৃতদের গন্ধ। চাপ চাপ রক্তের ছাপ মাটিয়ে মিশে । ঘাসেদের নরম বুকে সবুজ কোমল ছায়ায় ছোপ ছোপ রক্তগুলো বিশাল এক মানচিত্রের মত দেখায়। মনে হয় কোন এক কাজল বধু নতুন কাঁচা রংয়ের শাড়িটা অভিমানে বিছিয়ে দিয়েছে। থমকে দাড়াঁই। চাঁদের আলোয় ভুল দেখছিনা তো। চোখদুটো আরো বড় করে হৃদয়ের সবটুকু মনযোগ ঢেলে দেই। হ্যাঁ, এখানেই তো সেদিন অপারেশন হয়েছিল। বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল বাতাস, সেই সাথে আমাদের বুকগুলো। যেখানে কবর পাড়ার ছবিটা বুকে বেঁধে আমরা মাঠে নেমেছিলাম একটু সকাল সকাল ঘুমাবো বলে। কতদিন ঘুমাই না। ছাব্বিশজনের একটা দল। ওরা শতাধিক, সেই সাথে এদেশের কিছু বিশ্বাসঘাতক। ধানক্ষেতটা দুলে ওঠে। আড়চোখে নিজের বুকপকেটের দিকে তাকাই। কিছু একটা নড়ে ওঠে। ধানক্ষেতটা নড়েচড়ে বসে। পাশে বাবলার সাঁড়ি। একটা, দুইটা উচুঁ ঢিবি।

-বাদল আছিস? আমি সীমান্ত। চিনতে পারছিস ?

কবরের ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ আসে না। শহীদেরা নাকি মরে না। গেল অপারেশনে বাদল চলে গেল। বাদল সবসময় বলতো, দেখিস সীমান্ত, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কখনোই মরবো না। সবকটা’কে শেষ করে তারপর স্বাধীন পতাকাটাকে মাথায় জড়িয়ে মা’র কাছে যাবো। মা হাসতে হাসতে বলবে, তুই এখনো পাগলই রয়েগেলি। আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে চোখ বুঁজে পড়ে থাকবো। বাদল’কে কবরে নামাবার সময় ওর চোখদুটো খোলা ছিল। যেন কিছুতেই ঘুমাবে না। আমরা ওকে জোড় করে শুইয়ে রেখে এলাম। মুঠো মুঠো মাটি দিয়ে ঢেকে দিলাম ওর স্বপ্নটাকে। তারপর কবরের ভেতর একটা বাবলার ডাল পুঁতে রেখে চলে এলাম। মাঝে মাঝে সেই ডালটার সামনে মুখ রেখে সবার অজান্তে বাদলের সাথে কথা বলি।

- বাদল’রে রুটি খাবি?

কতদিনের উপোস ছিল। অপারেশনের আগে হঠাৎ বললো,

-সীমান্ত তোর মনে পড়ে মা কেমন করে রুটি বানাতো? চুলোর পিঠে বসে তুই আর আমি গরম গরম রুটি নালিগুঁড়ে ডুবিয়ে খেতাম। মনে পড়ে? কবে যে মায়ের হাতের রুটি খাবো। বাদল বুক ভরে শ্বাস নেয়। দূর বাতাস থেকে যেন মায়ের হাতের রুটির মিষ্টি গন্ধ নাকে ভেসে আসে। রুটির একটা টুকরো কবরের উপর রেখে একমুঠো মাটি তুলে নেই। বুক পকেটে রাখি। কিছু একটা বাধা দেয়। বুক পকেট টা আবার নড়েচড়ে ওঠে। হাঁটতে থাকি।
সামনেই ব্যারাক। কেউ একজন পিছন থেকে বলে ওঠে,
- স্টপ।
সাথে সাথে রাইফেলটা নামিয়ে দেই। হাতদুটো তুলে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। অন্ধকার থেকে একজোড়া হাত আমার শরীরে তল্লাশী চালায়। বুক পকেটে এসে থেমে যায়। পকেট টা আবার নড়ে চড়ে ওঠে। অন্ধকারের মানুষটার চোখে আলোর ঝিলিক খেলে যায়। সারা মুখে বিস্ময়ের চিন্হ নিয়ে আমাকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বলে। রাইফেল টা কাঁধে নিয়ে আবার ছুটতে থাকি। পরশু অপারেশন।

-ইয়েস স্যার, নম্বর এইটটিন স্যার । কমান্ডার মুখ তুলে তাকায়। কি খবর?
-সব ঠিক আছে স্যার।
-পরশু অপারেশন, জানো তো কোথায়?
-জ্বী , স্যার। মাথা নাড়াই।
- ঠিক আছে। তুমি জলিলের সাথে দেখা করো। স্যালুট দিয়ে ঘুরে দাঁড়াই। ট্রেনিংয়ের সময় স্যালুট দেয়া শিখেছিলাম। ভালোই লাগে। নিজেকে কেমন দক্ষ সৈনিক সৈনিক বলে মনে হয়। বুকে সাহস ফিরে পাই। বুক পকেট টা আবারো নড়ে ওঠে।

ভোর রাতে কমান্ডার ব্রিফিং করে।
-কিছুতেই ফিরে আসবে না। যদি সর্বস্বও হারাতে হয়। ভেবে নাও এই তোমাদের শেষ দেখা।
একে অপরের মুখের দিকে তাকাই। অমলের মুখটা ফ্যাকাসে। ঘরে কিশোরী বধু। আসন্ন নবজাতকের আগমনে উন্মুখ নবীন চোখ ভয়ে মৃতপ্রায়। অমলের পরিপক্ক বুক নতুন ফসলের ছোঁয়া লাগার অপেক্ষায়। এক্ষুণি চলে যেতে হবে। অমলের চোখে যেন আধাঁর নেমে আসে। পঞ্চাশোর্ধ্ব কেরামত আলীর চোখে জ্বলন্ত আগুন। চোখের সামনে মেরে ফেলেছে তার জোয়ান ছেলেটা’কে। বৌটাকেও রেহাই দেয়নি। টেনে হিঁচড়ে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেছে। তারপর একদিন এদোঁপুকুরে সদ্য বিকশিত পদ্মের মত ভেসে থাকতে দেখেছে নিথর দেহটা। দরজায় দাঁড়িয়ে কেরামত আলীর আশি বছরের বৃদ্ধা অন্ধ মা বুঝতে পারছিল না কি ঘটছে।
-ওই ক্যারামইত্যা, কারা আইছে রে?
কেরামত আলী তখন বাড়ির পিছনের পরিত্যক্ত ডোবার ভেতর ঘাপটি মেরে বসে। মিলিটারীদের একজন কেরামত আলীর মাকে কি একটা জিজ্ঞেস করে, বুড়ি বুঝতে পারে না। শরীফ মাতব্বর বুঝিয়ে বলে, কাকী, মেজর সাব জানবার চায় পুরান ধানে কি খই হয়? বৃদ্ধা না বুঝেই মাথা নাড়ায়। ক্যান হবে না বাজান, পুরান ধান থাইক্যাতো আরো ভাল খই হয়। একপশলা নিষ্ঠুরতার হাসি উঠোনে খেলা করে। তারপর, শকুনদের ছোবল থেকে সেও নিষ্কৃতি পায়না। কেরামত আলীর চোখ ঝলসে ওঠে। প্রতিশোধ যে তাকে নিতেই হবে। রশিদ ভাই আমাদের কমান্ডার, আমাদের দু’এক ঘর পড়ে তার বাড়ি। চোখে মুখে যার শিশুর সরলতা খেলা করতো। আজ সেখানে ঘৃণার আগুন, প্রতিশোধের নেশা। মিলিটারীরা তার সাত বছরের মেয়েটা’কে দুমড়ে মুচড়ে অবশেষে দু’পা টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। একটাই অপরাধ তার বাবা যুদ্ধে গিয়েছে। বউ টা হয়তো এখনো ওদের খাঁচায় বন্দী।

উদাস চোখে সামনের দিকে তাকাই। সূর্যটা চোখ মেলে তাকাতে এখনো অনেক বাকি। দিগন্তের শেষে কালো রেখা মাঠের শেষ সীমাকে ছুঁয়েছে। ধানগাছগুলো দুলছে, একটু একটু বৃষ্টি। স্মৃতির পাতাটা উল্টে যায়। একটা দৃশ্যপট ভেসে আসে।

বর্ষায় কদমতলীর ছোট্ট নদীটা ভরে উঠেছে। মাছ ধরার জালটা নিয়ে একদৌড়ে নদীর ঘাটে ছুটে যেতে উদ্দত এক যুবক। পিছন থেকে মা চিৎকার করে বলে,

- খোকা , যাসনে, শরীর খারাপ করবে। শাসনের দেয়াল টপকে যুবক ততক্ষণে মায়ের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে। নদীর ঘাটে যাবার পথে আড়চোখে কদমগাছের নিচটা দেখে নেয়। জানালার ফাঁক থেকে ততক্ষণে সরে গেছে কৌতুহলী কোন চোখ। যুবক হতাশ। ব্যস্ত পায়ে চলে যাবার ভান করে।
-ইস্, ঢং.........পেছন থেকে মৃদু তিরস্কার। একটু অপেক্ষা করলে কি হয়। কেউ যেন বাতাসের সাথে কথা বলে ওঠে।
-কারো সময় নাই। এখন ব্যস্ত, মাছ ধরতে হবে। যুবক বিড়বিড় করে। পেছনের কন্ঠস্বরটা বলে ওঠে, আজকাল লেখাপড়া ছেড়ে লোকের জেলে হবার সাধ হয়েছে। যত্তসব আদিখ্যেতা। আহারে, বইকারাত্ত, তুমি জাত-কূল মানলে না। যুবক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
- যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। বাড়ির ভেতর থেকে ততক্ষণে আরেকটা গলার আওয়াজ ভেসে আসে।
- মালতী, কার সাথে কথা বলছিস?
- কেউ না মা, বাতাসের সাথে। মালতী ছুটে বেড়িয়ে যায়। বৃষ্টির পানিতে তখন যুবকের র্দীঘশ্বাস মিশে একাকার হয়ে গেছে। এটুকু পেতেই তো এতটা পথ ছুটে আসা। স্মৃতির পৃষ্ঠাটা উল্টে যায়।
-কবে ফিরলে? জানো গ্রামে মিলিটারী ক্যাম্প বসেছে। আমার খুব ভয় হয়। শাহজাহান মাতব্বর কেমন করে আমার দিকে তাকায়। কি জানি মনে কোন দুষ্টু মতলব এটেঁছে। তুমি ভাল আছো তো? যুবক মাথা নাড়ায়। এর মধ্যে আর কতটা ভাল থাকা যায়। তবুও স্বান্তনা দিতে চেষ্টা করে।
-একটু সাবধানে থেকো। মার দিকে খেয়াল রেখো।
-আবার কবে আসবে?
-ট্রেনিং শেষ হলেই।
মালতী কিছু একটা বলতে যায়, গলাটা রুদ্ধ হয়ে আসে।
- ভালো থেকো।

ট্রেনিং শেষ করেই গ্রামে ফিরে যায় মা’কে দেখতে। কামার পাড়ার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আর এগুতে পারে না। চারদিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। গুলির শব্দ, আর্তনাদ, শিশুদের কান্না। মেয়েদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার শব্দ। জিপের হিসহিসানি। যুবক স্তব্ধ। আর এগোতে পারে না। পাশের ধানক্ষেতে ছিটকে পড়ে। একসময় চারপাশ শান্ত হয়ে আসে। যুবক উঠে দাঁড়ায়। বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। অন্ধকারে কিছু একটা পায়ে বেঁধে যায়। চাঁদের আলোয় প্রথমে বুঝতে বেশ কষ্ট হয়। চোখ রগড়ে আবার চেয়ে দ্যাখে, ভুল দেখছে নাতো। আশপাশে তাকায়। এখানে ওখানে আরো কিছু লাশ। রোমেলা চাচী, বিলুর মা, করিম চাচা । করিম চাচার দেহটায় কচিধানের শিষগুলো পরম মমতায় হাত বুলিয়ে যায়। কয়েকটা বুলেট মাথার খুলিটাকে ঝাঁঝড়া করে দিয়েছে। রাত ফুরিয়ে আসছে, ফিরে যেতে হবে। যুবক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। করিম চাচার দেহটাকে পেছনে ফেলে দ্রুত বাড়ির পথে হাঁটা দেয়।
-মা , মা আমি । দরজা খোল। ভেতর থেকে কোন সাড়া মেলে না। জিনিসপত্র লন্ডভন্ড। মেটে সানকি’তে কতগুলো পান্তা পরে। যুবকের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মাগো, কোথায় তুমি? ছিটকে বেরিয়ে যায়। জ্যোৎস্নার আলোতে ধবধবে সাদা কিছু একটা দেখে যুবক শিউরে ওঠে। ভূত নয়তো। সাহসে ভর করে এগিয়ে যায়। মাথায় অগণিত গহ্বর। কোথাও লাল লাল রক্তের ছাপ। মুখের একপাশটা চেনা যায়না। অসংখ্য দাঁতের চিন্হ এখানে ওখানে ছড়িয়ে। মনে হচ্ছে কে যেন নির্মম ভাবে বৈশাখের ঝড়ো হাওয়ার পটভূমিতে নকশীকাঁথা এঁকেছে। বুকটা ফাঁকা।দুধ সাদা শাড়ির ছিন্নভিন্ন আচঁলে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। একটা ভাঙ্গাচোড়া শরীর, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত। বুকের পর্বত কে যেন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। খড়ের গাঁদায় পড়ে আছে মায়ের দেহটা। যুবক হাত বাড়ায়। কিছু একটা খুঁজে পাবার চেষ্টা করে । মাগো..................স্মৃতির চোখ বুঁজে আসে।

ধানক্ষেত টা দুলছে। চোখের পাতায় ভর করে একজোড়া ঠোঁট। কতদিন ঘাসফুলের মত নরম ঐ ঠোঁটদুটোকে দেখে কেঁপে উঠেছে যুবক। গোলাপী গালে সকালের নরম রৌদ্রের পরশ বোলাতে দেখে যুবক কখনো কখনো ভেবেছে যদি মানুষ না হয়ে বাতাস হতো। চুপিচুপি ছুঁয়ে যেতো অধর। মালতী?
-হুম।
-আমার বউ হবি?
-ইস্ , শখ কতো।
-কেন , আমি কে দেখতে খারাপ? জানিস, ভার্সিটির কত মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে ক্লাসের কথা ভুলে যায়?
-হুম, ঠোঁট বাকিঁয়ে মালতী প্রতিত্তর করে। কিন্তু তাকিয়ে কি যে দ্যাখে সেটাতো তুমি জানো না , তাইনা? আমি অবশ্য জানি তারা কি দ্যাখে, বলবো?
-কি? যুবক ভয়ে ভয়ে জানতে চায়।
মালতী হাসতে হাসতে বলে,
-মেয়েগুলো অবাক হয়ে ভাবে এই বুড়ো খোকাটার এখনো গোঁফ গজায়নি কেন ।
-তবে রে । যুবক, শক্ত হাতে মালতীর খোঁপাটা চেপে ধরে। আকস্মিকতায় মালতীর চোখদুটো বিকশিত পাঁপড়ীর মত চেয়ে থাকে । যুবক মুখ নামিয়ে নেয়। এক ঝটকায় মালতী সরে আসে। যুবকের হাতে আটকে যায় মালতীর দীঘল কালো চুল। স্মৃতির পাতা ঝাপসা হয়ে আসে। সামনের ধানক্ষেতটা দুলছে। কচি ধানের শীষগুলো গড়াগড়ি খায়। যেন অধরের সাথে অধরের মিলন। অমল পাশে এসে দাড়াঁয়।
-ভয় পেয়েছিস, সীমান্ত। ঝাপসা চোখে সীমান্ত অমলের দিকে তাকায়। বুক পকেট থেকে উঁকি মারে কয়েকটা চুল।

কাল অপারেশন । কদমতলী গ্রামে । যেখানে মালতীর ধানের শীষের মত কচি শরীরে মানচিত্র আকঁছে পাকিস্তানী হায়েনারা।

অমাবস্যা
২৬শে মার্চ, ২০০৯
ইমেইল:fy.cvyasmin@amaderprojukti.com

ইশতিয়াক রউফ এর ছবি
১ | ইশতিয়াক রউফ | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১০:৩১

"মুক্তিযুদ্ধের গল্প"... লেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আপনার বর্ণনার শক্তির কাছে নত হয়ে কাঁপছি।


২

সুজন চৌধুরী এর ছবি
২ | সুজন চৌধুরী | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১০:৪০

ভয়াবহ ! পাকিগো ছিড়া ফালাইতে ইচ্ছা করে মাঝেমাঝে।


লাল গানে নীল সুর, হাসি হাসি গন্ধ

৩

মূলত পাঠক এর ছবি
৩ | মূলত পাঠক | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১১:১৫

অসাধারণ ! বর্ণনার কথা বাদই দিলাম, গল্পের গঠন/structure দেখেও মুগ্ধ হলাম।

আরো লেখা পড়বার আশায় রইলাম।


৪

সুলতানা পারভীন শিমুল এর ছবি
৪ | সুলতানা পারভীন শিমুল | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১৩:৫০

কি অসাধারণ বর্ণনার ধরণ আপনার।
ভীষন মুগ্ধ।

...........................

সংশোধনহীন স্বপ্ন দেখার স্বপ্ন দেখি একদিন


৫

নজরুল ইসলাম এর ছবি
৫ | নজরুল ইসলাম | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১৪:৩৫

খুব দারুণ লেখা... চলুক
______________________________________
পথই আমার পথের আড়াল


৬

মাহবুব লীলেন এর ছবি
৬ | মাহবুব লীলেন | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১৫:৪১

দুর্দান্ত গল্প
কিন্তু গল্পটা বোধহয় আরো কিছুটা বিস্তৃতি দাবি করে
অনেকগুলো ঘটনা পরপর ঘটছে
মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম

০২
সচলে স্বাগত অমাবস্যা


৭

অতিথি লেখক এর ছবি
৭ | অতিথি লেখক | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১৬:১০

পড়লাম..অনুভব করলাম..

বলার মত আর কিছু পাচ্ছিনা..শুধু সুন্দর একটি গল্প বলে বাহ্বা দিলে লেখাটাকে ছোট করা হবে...লেখাটা তার আপন শক্তিতে জায়গা দখল করে থাকুক...

( জয়িতা )


৮

নিবিড় এর ছবি
৮ | নিবিড় | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১৬:২২

দারুন একটা লেখা চলুক
আপনার আর লেখা পড়ার আশায় থাকলাম অমাবস্যা


মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় ।

৯

সাদামাটা এর ছবি
৯ | সাদামাটা (যাচাই করা হয়নি) | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ১৭:০১

এমন অসাধারণ গল্প অনেক দিন পর পড়লাম।


১০

রেনেট এর ছবি
১০ | রেনেট | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ২০:৪০

অসাধারণ গল্প, স্রেফ অসাধারণ!
(আমি মডু হলে শুধু মাত্র এই একটি গল্পের জন্য আপনাকে পূর্ণ সচল বানিয়ে দিতাম)
সচলে স্বাগতম!
---------------------------------------------------------------------------
If your father is a poor man, it's not your fault ; but If your father-in-Law is a poor man, it's definitely your fault.


১১

সুহান রিজওয়ান এর ছবি
১১ | সুহান রিজওয়ান | বিষ্যুদ, ২০০৯-০৩-২৬ ২৩:৩৮

অমাবস্যা'র আলোয় সচল ভেসে গেলো।
...গল্প দুর্দান্ত হয়েছে।


১২

শাহেনশাহ সিমন [অতিথি] এর ছবি
১২ | শাহেনশাহ সিমন [অতিথি] (যাচাই করা হয়নি) | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ০০:০৫

..................


১৩

তানবীরা এর ছবি
১৩ | তানবীরা | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ০১:১০

ভয়াবহ গল্প, এ চোখে ঘুম আসে না ........................।

তানবীরা
---------------------------------------------------------
চাই না কিছুই কিন্তু পেলে ভালো লাগে


১৪

নাজনীন খলিল এর ছবি
১৪ | নাজনীন খলিল [অতিথি] | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ০২:০৮

নির্বাক! স্তব্ধ!
স্যালুট লেখককে।


১৫

সচল জাহিদ এর ছবি
১৫ | সচল জাহিদ | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ০৫:২৮

চমৎকার গল্প, অসাধারন লেখনী। গল্পটি জহির রায়হানের 'সময়ের প্রয়োজনে' লেখাটিকে মনে করিয়ে দেয়।

-----------------------------------------------------------------------------
আমি বৃষ্টি চাই অবিরত মেঘ, তবুও সমূদ্র ছোবনা
মরুর আকাশে রোদ হব শুধু ছায়া হবনা ।।


১৬

সংসারে এক সন্ন্যাসী এর ছবি
১৬ | সংসারে এক সন্ন্যাসী | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ০৬:৪০

ঘৃণাজাগানিয়া গল্প!
খুবই চমত্কার।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
যৌনদুর্বলতায় ভুগছি দীর্ঘকাল। দুর্বল হয়ে পড়ি রূপময়ী নারী দেখলেই...


১৭

অতিথি লেখক এর ছবি
১৭ | অতিথি লেখক | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ১৫:৫৬

আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে অত্যাচারের আবরণ, তাকে কি করে বুকের ভেতর চেপে রাখি। নতুন প্রজন্ম জানুক কতটা অন্যায় করা হয়েছে আমাদের সাথে। সবার আন্তরিকার জন্য ধন্যবাদ। সচলদের অতিথি হয়ে যেন নিয়মিত হতে পারি সচলায়তনে এই প্রত্যাশায়-

অমাবস্যা
২৭ শে মার্চ, ২০০৯
আমাকে পাওয়া যাবে এইখানে fy.cvyasmin@ gmail.com অথবা fy.cvyasmin@amaderprojukti.com


১৮

ভূঁতের বাচ্চা এর ছবি
১৮ | ভূঁতের বাচ্চা [অতিথি] | শুক্র, ২০০৯-০৩-২৭ ১৯:১৬

অসাধারণ একটা গল্প !
--------------------------


১৯

s-s এর ছবি
১৯ | s-s | শনি, ২০০৯-০৩-২৮ ২০:৫৬

চমতকার!

আদৌ কি পরিপাটি হয় কোনো ক্লেদ?ঋণ শুধু শরীরেরই, মন ঋণহীন??



Me

Me

About this blog

Hello

This is Fahmida. You may imagine me as a five feet white ball. Completed MBA in Management . ভাললাগে গ্রাফিক্সের টুকিটাকি। শখ ছিল ফটোগ্রাফার হবো কিংবা সাংবাদিক। হইনি কিছুই। পেশায় ব্যাংকার। জন্ম উত্তর বঙ্গে। বসবাস দক্ষিণে। মাঝে মাঝে এক আধটু প্যাঁচাই। যদিও আমার লেখালেখির হাতেখড়ি আপ্র (http://forum.amaderprojukti.com/memberlist.php?mode=viewprofile&u=1094) থেকে তারপরও মাঝে মাঝে প্রথম আলো ব্লগেও মাঝেমাঝে ঢুঁ মারি। নিক আঁধার http://prothom-aloblog.com/users/base/adhar/p1 । আজকাল সচলদের অতিথি হতে ভাল লাগে। নিক অমাবস্যা। ইদানীং টিউরোটিয়াল বিডি'তে লেখার চেষ্টা করছি। গান শোনা, কবিতা পড়তে ভালবাসি। ভালবাসি ব্লাক কফি আর সিলেটের চা-পাতা । এক কথায় Im busy for nothing :)


লাইসেন্স:Licence
by-nc-nd (Creative Commons)

My Blog List